য়ে গোত্রের লোকেরা ১০০ বছরের আগে মারা যায় না





mmm







বিশ্বে এমন একটি গোত্র রয়েছে, যাদের গড় আয়ু ১০০ বছরেরও বেশি। এই গোত্রের কিছু সদস্য ১২০ বছর পর্যন্তও বেঁচে থাকেন। কথিত আছে, ১৯৮৪ সালে এক অর্ধবয়স্ক ব্যক্তি, আবদুল মবুদ, ইংল্যান্ডের হিথ্রো বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন অফিসে পাসপোর্ট দেখানোর পর তোলপাড় সৃষ্টি করেন। পাকিস্তানের গিলগিট বালটিস্তানের হুনযা জেলায় বসবাসকারী এই ব্যক্তির পাসপোর্টে  বয়স লেখা ছিল ১৬০ বছর, অথচ তার চেহারা বা শরীরের গড়ন দেখে কেউই তা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। প্রথমে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা বিষয়টি বিশ্বাস করতে চাননি, কারণ তারা মনে করেছিলেন, কিছু

একটা গণ্ডগোল আছে। কিন্তু আবদুল মবুদ দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, তার বয়স সত্যিই ১৬০ বছর।এই ঘটনা এক হংকংয়ের পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। পরে জানা যায়, ব্রুশোদের মধ্যে ১০০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা অনেক। ৫০০ বছরের সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনা করলে দেখা যায়, পৃথিবীর মানুষের গড় আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আজকের দিনে শিশু মৃত্যুর হার কমে যাওয়ার পাশাপাশি মহামারী এবং যুদ্ধে মৃত্যুর সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কম। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এখন অনেক জটিল রোগ থেকে সহজেই মুক্তি মেলে।দুশো বছর আগে ফিরে গেলে দেখা যায়, জন্মের পর একটি শিশুকে শৈশব কৈশোরে নানা রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে বাঁচতে হত। যারা বেঁচে যেতেন, তারা অনেকেই ৯০-১০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতেন। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের মানুষের গড় আয়ু ৭০-৭২ বছর। যদিও বর্তমানে ১০০ বছরের বেশি বেঁচে থাকার সংখ্যা কম, তবুও এর ব্যতিক্রম হলেন পাকিস্তানেরব্রুশোআদিবাসীরা। আধুনিক নগর সভ্যতা থেকে দূরে থাকা সত্ত্বেও বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রা দীর্ঘায়ুর জন্য তারা পরিচিত। তাদের আবাসস্থল, হুনযা উপত্যকা, তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যও বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

কোথায় সেই  হুনযা উপত্যকা 

কাশ্মীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের একটি অপার অঞ্চল, যা ভারত-পাকিস্তানের বিতর্কিত এলাকা হিসেবে পরিচিত এবংভূ-স্বর্গনামে খ্যাত। কিন্তু কাশ্মীরের নিকটেই এমন একটি স্থান রয়েছে, যা অনেকের কাছে অজানা। এটি পাকিস্তানেরগিলগিট বালটিস্তান’, যা আফগানিস্তান-চীন সীমান্তে অবস্থিত। এখানকার নৈসর্গিক সৌন্দর্য কাশ্মীরের চেয়ে কম নয়।গিলগিটের একটি জেলা, হুনযা। এটি চারটি বিখ্যাত পর্বতমালাহিমালয়, কারাকোরাম, পামির এবং হিন্দুকুশের কোল ঘেঁষে রয়েছে। হুনযা উপত্যকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক জীবন্ত উদাহরণ। এর দৃশ্যাবলী যেমন অপূর্ব, তেমনি এখানে রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস।মহাভারতঅনুসারে, এই অঞ্চল গান্ধার রাজ্যের অংশ ছিল। যদিও খ্রিস্টপূর্ব সময়ের কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই হুনযা উপত্যকার বিষয়ে, তবে জানা যায় যে, ৭ম শতাব্দীতে এখানে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের আগমন ঘটে।ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের আগমনের আগে হুনযা ছিল একটি স্বাধীন রাজ্য,


যেখানেথামশাসকদের শাসন ছিল। মুসলমানদের ভারতবর্ষে প্রবেশের পর এখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয় এবংথামরা ইসলাম গ্রহণ করেমীরনাম ধারণ করেন। ১৮৯০ সালে, ব্রিটিশরা একটি সেনা অভিযানের মাধ্যমে তখনকার শাসক মীর শাফদার আলী খানকে পরাজিত করে। এর ফলে এক হাজার বছরের স্বাধীনতা হারিয়ে হুনযা উপত্যকা জম্মু-কাশ্মীরের মহারাজার অধীনে চলে আসে।১৯৩৫ সালে, মহারাজার সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশরা হুনযার নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং গিলগিট এজেন্সির সঙ্গে সংযুক্ত করে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময়, কাশ্মীরের মহারাজা ব্রিটিশদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেন এবং হুনযা উপত্যকায় পুনরায় নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তবে হুনযার বাসিন্দারা বিদ্রোহ করে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। পাকিস্তানের অংশ হওয়ার পরও, হুনযা একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যমান ছিল।১৯৭৪ সালে, প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এই সমস্যা সমাধান করেন। বর্তমানে, এটি গিলগিট বালটিস্তানের একটি জেলা। ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো, হুনযাতেও বিভিন্ন শাসক গোষ্ঠীর রাজত্ব ছিল, কিন্তু এখানে প্রায় এক হাজার বছর ধরে স্বাধীন থাকার ফলে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন তাদের ছুঁতে পারেনি। ব্রিটিশ যুগ পার করে, বর্তমানে পাকিস্তানের অংশ হলেও, হুনযার আদিবাসীরা আজও তাদের প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধারণ করে রেখেছে।

কারা হুনযা আদিবাসী


হুনযা উপত্যকায় বসবাসকারী জনগণকে বুরুশো, ব্রুশো, বা হুনযাকুট বলা হয়। এই আদিবাসীরা মোট তিনটি ভাষায় কথা বলেন। ভাষাগত পার্থক্যগুলোর কারণ তাদের বাসস্থানের অবস্থান। নিচু অঞ্চলের অধিবাসীরাশিনা’ (Shina) ভাষায় কথা বলেন, পাহাড়ি নিচু অঞ্চলের মাঝের বাসিন্দারাবুরুশাস্কি’ (Burushaski) ভাষায় এবং উচ্চভূমির বাসিন্দাদের গোজাল (Gojal) নামে পরিচিত, যারাওয়াখি’ (Wakhi) ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করেন।ব্রুশোদের হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের জন্য তারা এক বৈচিত্র্যময় জাতি, এবং তাদের মধ্যে তিনটি পৃথক ভাষা টিকে আছে। ব্রুশোদের একটি কিংবদন্তি রয়েছে, যা তাদের গোড়াপত্তনের সঙ্গে আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেটের সেনাবাহিনীর ভারত আক্রমণের সময়কে যুক্ত করে। অভিযানের শেষে সৈন্যদল ফিরে গেলেও তিন সৈনিক এখানে থেকে যান, যাদের হাত ধরে গড়ে ওঠে ব্রুশোদের তিনটি বসতি।গিলগিট বালটিস্তানের হুনযা জেলা আয়তনে খুব বড় নয়, কিন্তু এখানে এক জাতির তিনটি আলাদা ভাষা হাজার বছর ধরে টিকে আছে। এটি সম্ভব হয়েছে কারণ স্থানীয় আদিবাসীদের মধ্যে মিশ্র সংস্কৃতি গ্রহণের প্রবণতা কম। তবে, তারা এখনও সেই পুরনো যুগে পড়ে নেই। বরং, এই দুর্গম পর্বতবাসীরা পাকিস্তানের অন্যতম সর্বোচ্চ শিক্ষিত জনগণ, যার স্বাক্ষরতার হার ৯৭ শতাংশ এবং অধিকাংশই পেশাদার ডিগ্রিধারী।পাকিস্তানে মুসলিম জনসংখ্যার অধিকাংশই সুন্নি, কিন্তু শিয়াদের সংখ্যা প্রায় শতাংশ। ব্রুশো আদিবাসীরা এই অল্প সংখ্যক শিয়া মুসলিমের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, যারা ইসমাঈলি শিয়া মতবাদের অনুসারী। তাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা করিম আগা খান, যিনি ইসমাঈলি শিয়া মতবাদের ৪৯তম ইমাম।ব্রুশোরা যেমন হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের অধিকারী, তেমনি ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে অন্যান্য মুসলিমদের থেকে আলাদা। তাদের আচরণ স্বভাবের দিক থেকেও ভিন্নতা রয়েছে। বলা হয়, গোটা পাকিস্তানে তাদের মতো অতিথিপরায়ণ আর কেউ নেই।বর্তমান যুগে ৫০-৬০ বছর বয়সে বাঁচার আশা করা যায় না, কিন্তু ব্রুশোদের কাছে ৫০ বছর বয়স মানে জীবনযাত্রার অর্ধেক। তারা ক্যারিয়ারের চিন্তা করে না, যদিও শিক্ষায় তারা অনেক উন্নত। নগরের উন্নত জীবন বা আধুনিকতার প্রতি তাদের কোনো আকর্ষণ নেই। একজন ব্রুশো আদিবাসীর কাছে পরিবার এবং গ্রামের গুরুত্ব অপরিসীম, যা হাজার বছর আগে যেমন ছিল, আজও তাই রয়ে গেছে।

 

দীর্ঘায়ুর রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা

এর আগেও ১৯৬৩ সালে হুনযা উপত্যকায় ফ্রান্সের একদল গবেষক এসেছিলেন এবং তাদের জরিপে ব্রুশোদের গড় আয়ু ১২০ বছর হিসেবে উঠে এসেছিল।ব্রুশো আদিবাসীদের দীর্ঘায়ু নিয়ে অনেক কিংবদন্তি প্রচলিত, তবে এর সমাধান বিজ্ঞান থেকেই পাওয়া যায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের পরিবেশ, জলবায়ু, এবং খাদ্যাভ্যাসই দীর্ঘ জীবনের মূল কারণ। করোনাকালে মানুষ উপলব্ধি করেছে যে, যদি পরিবেশকে একটু বিশ্রাম দেওয়া যায়, কার্বন নিঃসরণ কমানো যায় এবং সচেতনভাবে চলা যায়, তবে প্রকৃতি কতটা উদার হতে পারে। শুরুতেই বলা হয়েছে, হুনযা উপত্যকা দূষণমুক্ত। তাই সেখানে বাসিন্দাদের প্রকৃতির সঙ্গে শত্রুতার বদলে বন্ধুত্ব রয়েছে।হুনযার তিন অঞ্চলের বাসিন্দারা কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। তারা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত খাবার খান না; বরং হিমালয়ের ঠান্ডা পানিতে তাদের ফসল উৎপন্ন হয়। অনেক গবেষক মনে করেন, বিশুদ্ধ পানি ব্রুশোদের দীর্ঘায়ুর মূল নিয়ামক। বর্তমানে পৃথিবীর অনেক দেশ হুনযা উপত্যকার সমমানের পানি সরবরাহের চেষ্টা করছে।বছরে শুধু গ্রীষ্মকালীন সময়েই তারা চাষাবাদ করতে পারে, অন্য সময় মজুদ করা শষ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। কারণে এমন ফলমূল চাষ করা হয়, যা শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়।


এর মধ্যে এপ্রিকট (Apricot) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, কপার লৌহ ধারণ করে। এর রস, তেল, এবং শুকনো বীজ খাদ্যের জন্য উপযোগী।এপ্রিকটের উপকারিতা অসীম, এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং চেহারায় বিশেষ উজ্জ্বলতা নিয়ে আসে। তাই যদি কখনো ৩০ বছর বয়সী কোনো ব্রুশো রমণীর সাথে দেখা হয়, তাকে ষোড়শী মনে করা অসম্ভব নয়।হুনযা আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে একজন ব্রুশো নারী। তারা আসলে কোনো অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার কারণে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকেন না। বর্তমান যুগে ৫০ বছরের আগে আমাদের যেসব রোগ হয়, ব্রুশোদের ক্ষেত্রে সেসব ঘটে না। এর পেছনে রয়েছে তাদের চমৎকার পরিবেশ, জলবায়ু এবং বিশেষ কিছু খাবার, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তাছাড়া, তারা এমন একটি সংরক্ষিত পরিবেশে বাস করেন, যেখানে কোনো রোগজীবাণু সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে না।

 

 

 

 

 

 

 

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন