![]() |
| চুক্তি বাস্তবায়নকারী তিন জন মিশরের প্রেসিডেন্ট, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ও ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট |
বিশ্ব ইতিহাসে মুসলমানদের জন্য একটি অপমানজনক ঘটনা। অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শান্তি চুক্তি।১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইহুদিরা জয়লাভ করে এবং ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। তৎকালীন আরব দেশগুলি ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে এবং ইসরায়েলকে ধ্বংস করার হুমকি দেয়। এই পরিস্থিতিতে মিশর সুয়েজ খাল ব্যবহারের জন্য পশ্চিমাদের উপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করে।ফলস্বরূপ পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি হুমকির মুখে পড়ে। মিশরের সুয়েজ খাল দখল করতে মরিয়া হয়ে ইসরায়েল এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা তখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১৯৫৬ সালে মিশর আক্রমণ করে কিন্তু ব্যর্থ হয়। মিশরের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি গামাল আবদেল নাসের ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সিরিয়া ও জর্ডানকে একত্রিত করেন এবং ইসরায়েলকে ধ্বংস করার জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। কিন্তু পশ্চিমা শাসক এবং গুপ্তচরদের হস্তক্ষেপের কারণে মুসলিম যুদ্ধ পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। ইসরাইল হঠাৎ করেই মিশরের সমস্ত বিমান ঘাঁটি আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেয়। ইসরাইল এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা বিমান হামলা করে এবং মাত্র ৬ দিনের মধ্যে মিশর, সিরিয়া এবং জর্ডানকে পরাজিত করে। যুদ্ধের পর ইসরাইল মিশরের সিনাই উপদ্বীপ, গাজা উপত্যকা, জর্ডানের গাজা পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং সিরিয়ার গোলান হাইটস দখল করে। ইসরাইলের এই অপমানজনক পরাজয় মিশর, সিরিয়া এবং জর্ডানকে ব্যাপকভাবে দুর্বল করে দেয়। সিনাই উপদ্বীপে প্রায় ৫,০০,০০০ মিশরীয় বাস করত। অন্যদিকে ভৌগোলিকভাবে এটি মিশরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল। তাই ১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর এই উপদ্বীপকে মুক্ত করার জন্য তৎকালীন মিশরীয় রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ আনোয়ার আল-সাদাত সিরিয়ার সাথে জোটবদ্ধ হয়ে আবার ইসরায়েল আক্রমণ করেন যা ইতিহাসে অক্টোবর যুদ্ধ নামে পরিচিত। মিশরের অপ্রত্যাশিত আক্রমণের কারণে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী পিছু হটলেও মার্কিন-সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতায় ইসরায়েল তার শক্তি বৃদ্ধি করে এবং মিশরীয় সেনাবাহিনীকে রুক্ষে দেয় । সোভিয়েত ইউনিয়ন মিশরকে পারমাণবিক বোমার হুমকি দেয় এবং যুদ্ধবিরতির উপর চাপ সৃষ্টি করে।কূটনৈতিক ও সামরিক উভয় দিক থেকেই বিধ্বস্ত মিশরের রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাত পরাজয় মেনে নেন এবং মিশরের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন। অবশেষে ১৯৭৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মার্কিন রাষ্ট্রপতি জিমি কার্টারের উপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাত এবং তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিন ঐতিহাসিক ক্যাম্প ডেভিড চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তির মূল অংশগুলি ছিল:
* মিশর ইসরায়েলকে একটি রাষ্ট্র হিসেবে
স্বীকৃতি দেবে এবং ইসরায়েলের সাথে আর যুদ্ধে জড়াবে না।
* সিনাই উপদ্বীপ
মিশরে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।যা ইসরায়েল ১৯৮২
সালে ফিরিয়ে দিয়েছিল।
* মিশরের
অর্থনৈতিক ও সামরিক অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মিশরে ১.৩
বিলিয়ন ডলার সহায়তা।
* ফিলিস্তিনি
সমস্যার সমাধান: ফিলিস্তিনি ভূমি থেকে ধীরে ধীরে সেনা প্রত্যাহার এবং পশ্চিম তীর ও
গাজায় ফিলিস্তিনিদের স্বায়ত্তশাসন প্রদানের পরিকল্পনা।
এই অবমাননাকর চুক্তিটি মিশরীয় জিহাদি গোষ্ঠী এবং ফিলিস্তিনিরা প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং মিশর আরব বিশ্বের অন্যান্য অংশ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকে এবং আরবদের মধ্যে ঐক্য নষ্ট হয়।ফিলিস্তিনি গেরিলা যুদ্ধ রোধ করতে এবং মিশর থেকে গাজায় অস্ত্র পাচার রোধ করতে ইসরায়েল মিশরের রাষ্ট্রপতি সাদাতের সহায়তায় ফিলাডেলফিয়া করিডোর তৈরি করে। এই পদক্ষেপ আজও ইসরাইলকে মিশরীয় জিহাদি গোষ্ঠী এবং ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা আন্দোলন হামাস
উভয়ের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি বজায় রাখতে সাহায্য করেছে।"ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি" স্বাক্ষরের জন্য রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাত এবং প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিনকে নোবেল শান্তি পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। কিন্তু মুসলিম বিশ্ব জানে যে এই পুরস্কার ব্যবস্থা শান্তির নামে মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা আগ্রাসন এবং ইসরায়েলি আধিপত্য বিস্তারের একটি নীলনকশা ছাড়া আর কিছুই নয়। ১৯৮১ সালে মিশরীয় জিহাদিরা এই চুক্তির প্রতিশোধ নিতে রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাতকে হত্যা করে।

.jpg)
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন